সিদ্ধান্ত

digitalsomoy

সুরাইয়া শারমিন  

আমার হাসবেন্ডের ক্যান্সার ধরা পড়েছে। তাই আমরা সবাই খুবই আপসেট। ছেলের ফ্লাটের বসার ঘরে সবাই বসে আছি। এখনো ছেলে অফিস থেকে বাসায় ফেরেনি। আসলে সবাই মিলে ঠিক করবো ছেলের বাবার চিকিৎসা কোথায়, কীভাবে হবে। সবাই বলতে ছেলে, বৌমা, নাতি আর আমরা দু’জন।

সারাজীবন যা ইনকাম করেছি তার সবাই তো ছেলের পেছনে খরচ হয়েছে। ভালো স্কুলে পড়ানো, ওর সমস্ত চাহিদা মেটানো সব শেষে পেনশনের টাকার সবটা তুলে বড়লোকের মেয়ের সাথে বড়োলোকি ভাবে ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান করে, ছেলের বিয়ে দেওয়া। নিজেদের সব দায়িত্ব পালন করেছি। ছেলের কোন সাধ অপূর্ণ রাখি নাই।  আজ এত বড় একটা অসুখ ধরা পড়ার পর মনে হচ্ছে কিছু টাকা আমাদের নিজেদের অসুখ-বিসুখ, ভালো-মন্দের জন্য রাখা দরকার ছিলো। ছেলে বড় চাকরি করে ভালো বেতন পায়। তবে তাদের সংসারের খরচও তো অনেক। ছেলে ফ্লাট কিনেছে সেটার কিস্তি পরিশোধ হয় নাই এখনও।

ফ্লাট কেনার আগে বলেছিলাম বাবা ফ্লাট না কিনে আমাদের পুরাতন বাড়িতেই তোমার নিজের জন্য তিনতলাটা আধুনিক করে করে নাও। ছেলে রাজি হয় নাই। বলেছে তার পক্ষে এই চিপা গলিতে থাকা সম্ভব না। আমরা আর কিছু বলিনি। কারণ সে এখন তার নিজের মতো চলার বয়সে এসে গেছে। এখানতো আর আমাদের সব বিষয়ে দখল চলে না। বেল বাজলো ছেলে এসে গেছে মনে হয়।  ছেলে এসে সালাম দিয়ে ভেতরে চলে গেলো, বৌমাকে বললাম ও ফ্রেশ হয়ে আসুক এক সাথে চা খাবো সবাই। ছেলে এসে  আমাদের সাথে বসলো। আর মন খারাপ করে কথা বলতে লাগলো। আমারও চোখে পানি চলে আসলো।

এই কথা সেই কথার বলার পর আসলো চিকিৎসার বিষয়, ছেলে বললো, মা, আমরা ঢাকাতেই বাবার চিকিৎসা শুরু করি, আমি আমার বন্ধুর সাথে কথা বলেছি। সে বলেছে এখন ঢাকায় ক্যান্সার হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা হয়। প্রাইভেট ক্লিনিক বা হাসপাতালে শুধু শুধু ফালতু খরচ চিকিৎসা একই হয়। তখন আমি বললাম হুম তাতো ঠিক কথা। কিন্তু কিছুদিন আগে তুইতো বাবা তোর ছেলের টনসিল অপারেশন করালি স্কয়ারে, বললি দেশে তোর একমাত্র স্কয়ার হাসপাতালের উপরে একটু ভরসা হয়।

ছেলে বলল, মা ক্যান্সারের চিকিৎসা অনেক ব্যয় বহুল। বাবার চিকিৎসার টাকা কোথা থেকে আসবে? এত টাকা খরচ করা আমার একার পক্ষে সম্ভব না। ছেলের বৌটা বার বার টেবিল থেকে উঠে যাচ্ছে, ওর মনে হয় এই আলোচনাটা ভালো লাগছে না।  আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না ছেলের এত হিসাব-নিকেশ করা কথাবার্তা, আমি হঠাৎ করে বললাম তোমার কাছে কি আমরা চিকিৎসার টাকা চেয়েছি? ছেলে হতবাক হয়ে আমার দিকে চাইলো!

আমি তখন বললাম, শোন বাবা, যেদিন তোর বাবার ক্যান্সার ধরা পড়েছে সেই দিন সারারাত আমি ঘুমাইনি। অনেক কেঁদেছি। সকালবেলা তোর বাবার সাথে কথা বলে জীবনের শেষ বেলায় একটা সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি। সেই সিদ্ধান্ত তোকে আর বৌমাকে জানাতে এসেছি। বৌমাকে ডাকলাম এবং বললাম, মা বসো, আমাদের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তোমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য এসেছি।

তার পর বলতে শুরু করলাম। তোমার শ্বশুর যখন জায়গাটা কেনে তখন আমার নামে কেনে এবং বাড়িটাও আমার নামে। আমাদের চিপা গলির জায়গার মূল্য এখনকার বাজারে দুই কোটি টাকা। আমি পাশের বাসার আমজাদ ভাইয়ের সাথে কথা বলেছি সে কিনতে রাজি। আমার ছেলে যখন ফ্লাট কেনে তখনই আমজাদ ভাই বলেছিলো বাড়ি বিক্রি করলে আমাকে বলবেন আমি কিনবো।  এই টুকু শুনেই ছেলে অবাক হয়ে বলে উঠলো,মা কি বলো তুমি? বাড়ি বিক্রি করে দেবে? বাবার এত কষ্টের বাড়ি? আর দাম তো অনেক কম বলছে। এই জায়গার দাম তিন কোটির বেশি হবে।

আমার সিদ্ধান্তে ছেলে মনে হয় কিছুটা হতাশ হলো। আমি বললাম শোন বাবা, মানুষের চাইতে বাড়ি বড় না। আমি তোমার বাবাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাহিরে নিয়ে যাবো। জীবনে তো তোমার বাবা তার কোন স্বাধ আহ্লাদ পূরণ করে নাই। সারাজীবন শুধু চাকরি করে গেছে আর সংসারের ঘানি টেনেছে। শেষ জীবনে আমাদের কাছ থেকে তার তো এই টুকু পাওয়ার অধিকার আছে।

আমার হাসবেন্ড তখন দুই চোখে পানি নিয়ে আমার দিকে তাকালো। আর একটা হাত আলতো করে আমার হাতের উপরে রাখলো। আমি আবারো স্বাভাবিকভাবে বলা শুরু করলাম, আমরা চিকিৎসা বাবদ খরচ করবো এক কোটি টাকা, আর এক কোটি টাকা ব্যাংকে রাখবো। মাসে আশি থেকে নব্বই হাজারের মতো পাবো, তা দিয়ে আমরা মনে হয় ভালোই চলতে পারবো। তোমাকে সব জানালাম এই করণে তুমি যেন চিন্তা মুক্ত থাকতে পারো। এতক্ষণ পর আমার বৌমা কথা বলল। মা আমি আপনার সিদ্ধান্তে খুবই আনন্দিত। মা দোয়া করবেন আমিও যেনো আপনার মতো হতে পারি। আমাকে যেনো কখনো কারো করুণার পাত্র হতে না হয়।

লেখক :  উদ্যোক্তা, স্বত্বাধিকারী, অনলাইন প্লাটফর্ম ‘সুরাইয়া’।