দেশীয় এয়ারলাইন্স টিকিয়ে রাখতে এখনই উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন

digitalsomoy

মাত্র দুইটি এয়ারক্র্যাফট নিয়ে ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই ইউএস-বাংলার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এর অল্পদিনের মধ্যে ৭৬ সিট বিশিষ্ট আরও একটি এয়ারক্র্যাফট যুক্ত হয় তাদের বহরে। ঢাকা-যশোর-ঢাকা রুটের মধ্যদিয়ে তাদের এ যাত্রা শুরু হয়। ইউএস বাংলার এ পথচলায় বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে সম্প্রতি ডিজিটাল সময়ের সঙ্গে কথা হয় ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের জেনারেল ম্যানেজার (পাবলিক রিলেশন) মো. কামরুল ইসলামের। বিস্তারিত লিখেছেন মাহবুব শরীফ

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের পথচলার প্রারম্ভ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির জেনালেন ম্যানেজার (পাবলিক রিলেশন) মো. কামরুল ইসলাম বলেন,‘দেশের এভিয়েশন ট্রেন্ড বা পলিশি অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি বিমান সেবা চালু করতে চায় তাহলে তাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) গ্রহণ করতে হয়। পরবর্তী ধাপে ইনফ্রাশটাকচার ডেভেলপ, এয়ারক্র্যাফট ম্যানেজ, রুট পার্মিট পাওয়ার পর আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে এয়ার অর্ডিনেন্স সার্টিফিকেট (এওসি) গ্রহণ করতে হয়। সব ঠিকঠাক থাকলে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান বিমান সেবা চালু করতে পারে।’

বেসরকারি বিমান সেবা চালুর এক বছরের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীন যতগুলো বিমান বন্দর রয়েছে সকল রুটে একের অধিক বিমান চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। এতে করে যাত্রীরা উল্লিখিত জায়গায় সকালে গিয়ে আবার সন্ধ্যায় গন্তব্যে ফিরতে পারেন। এ রুটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কক্সবাজার, ঢাকা- সৈয়দপুর, ঢাকা- যশোর, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-রাজশাহী।

বিমান সেবা চালুর দ্বিতীয় বছরে তারা যে লক্ষ্য নিয়ে সামনের দিকে এগিয়েছে সে সম্পর্কে কামরুল ইসলাম বলেন,‘দুই বছর পূর্তি হওয়ার আগেরই আমরা আন্তর্জাতিক রুটে বিমান চলাচল শুরু করবো বলে আমাদের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলাম। বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন ও এভিয়েশন ট্যুরিজম মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক রুটে বিমান চলাচলের অনুমোতি দিয়েছিল। আমাদের যাবতীয় প্রস্তুতি শেষে ২০১৬ সালের ১৫ মে ঢাকা থেকে কাঠমুন্ডু রুটের মধ্যদিয়ে আন্তর্জাতিক বিমান পরিচালনা শুরু করি।’

তৃতীয় বছরে মধ্যে বিগার এয়ারক্র্যাফট আনার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। পরিকল্পনা অনুযায়ী বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এয়াক্র্যাফট যুক্ত করে তাদের বহরে। এ বিষয়ে কামরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম বছর থেকেই আমরা একটি লক্ষ্য নিয়ে আগাচ্ছি। তৃতীয় বছরে আমাদের লক্ষ্য ছিলো আমরা সিঙ্গাপুর, কুয়ালামপুর, ব্যাংকক ও মধ্যপ্রাচ্যে বিমান চলাচল সেবা চালু করবো। অর্থাৎ, যে দেশগুলোতে বাংলাদেশি প্রবাসী বেশি রয়েছে সে দেশগুলোতে আমাদের বিমান চলাচল করবে। লক্ষ্য অনুযায়ী তৃতীয় বছরেই আমরা এই রুটগুলোতে বিমান পরিচালনা শুরু করি। চতুর্থ বছরে এসে আমাদের লক্ষ্য ছিলো চীনেও আমাদের বিমান সেবা থাকবে। চীনের সিভিলিয়েশন অথোরেটির শর্ত পূর্ণ করে এর আগে বাংলাদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান বিমান সেবা চালু করতে পারেনি। ইউএস বাংলা তাদের যাবতীয় শর্ত মেনে পথচলার চতুর্থ বছরেই চীনের সঙ্গে বিমান পরিচালনা সেবা চালু করতে সক্ষম হয়। এরই অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকা-গুয়াংজু-ঢাকা রুটে বিমান পরিচালনা শুরু হয়।’

আমাদের পার্শবর্তী রাষ্ট্র ভারতে প্রচুর বাংলাদেশি প্রচুর যাত্রীর আসা-যাওয়া রয়েছে। বিশেষ করে যারা চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইতে যান তারা কোলকাতা ট্রানজিট করে যেতেন। ইউএস বাংলা এ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আমলে নিয়ে ২০১৮ সালে ঢাকা -চেন্নাই রুটে বিমান চালুর পরিকল্পনা করে। এতে করে যাত্রীরা মাত্র একটি ইমিগ্রেশনের মাধ্যমে তাদের কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারেন বলেও জানান কামরুল ইসলাম। 

তিনি জানান, বিগত ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশের প্রাইভেট এয়ারলাইন্সগুলোর একটি ট্রেন্ড ছিলো, সবাই পুরাতন বিমান দিয়ে যাত্রী সেবা দিয়ে আসছিল। শুরুর দিকে ইউএস বাংলার বিমানগুলোর গড় বয়স ছিলো ১৫ বছর। ইউএস বাংলা সিদ্ধান্ত নিলো, সেবাকাজে নিয়োজিত সকল বিমানের গড় বয়স ১০ বছরের মধ্যে নিয়ে আসার। দেশের অভ্যন্তরীন রুটে ইউএস বাংলার আগে কেউ নতুন বিমান ব্যবহার করেনি। পরবর্তীতে আরও ৭টি নতুন বিমান যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বহরে।

যাত্রীদের লাগেজসহ পণ্য বুঝে পাওয়ার ভোগান্তির কথা কারও অজানা নয়। ইউএস বাংলা যাত্রীদের ভোগান্তি দূর করে সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণে বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আগে বিদেশ থেকে কোনো যাত্রী দেশে আসলে তার পণ্যসহ ব্যাগ বুঝে পেতে ৩/৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। এ বিষটি আমলে নিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক রুটের বিমান যাত্রীদের লাগেজ ১৫ মিনিটের মধ্যে বেল্টে প্রদর্শন ব্যবস্থা শুরু করি।’

যাত্রীদের দূর্ভোগ কমাতে ইউএস বাংলা আর কি পদক্ষেপ গ্রহন করেছে? এমন প্রশ্নের জবাবে কামরুল ইসলাম বলেন,‘অভ্যন্তরীর রুটে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের সকল বিমান সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো ঢাকা হয়ে অন্য রুটে যাওয়ার ব্যবস্থা চালু করে। এতে যাত্রীরা দেশের যেকোনো বিমানবন্দর থেকে ঢাকা না হয়ে অন্য বিমানবন্দরে যাতায়াত করতে পারতেন না। ইউএস বাংলা এ ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করে ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ থেকে অভ্যন্তরীন রুটগুলোতে সরাসরি বিমান চলাচল শুরু করে। বর্তমানে যাত্রীরা যশোর থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার থেকে যশোর, সৈয়দপুর থেকে- চট্টগ্রামসহ যেকোনো রুটে ঝামেলাহীনভাবে চলাচল করতে পারছে।’

করোনাকালীন সময়ে ইউএস বাংলার সার্বিক অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে কামরুল ইসলাম বলেন,‘করোনাকালীন সময়ে অনেক বড় বড় কোম্পানি তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে, কর্মী ছাটাই করেছে। ঐ সময়টায় ইউএস বাংলা টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। সরকারের কাছ থেকে আমরা বিভিন্ন সহায়তার পাওয়ার চেষ্টা করেছি। করোনার সময় বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি যাত্রী যারা দেশে আসতে পারছিলেন না তাদেরকে দেশে আনার জন্য সরকার ইউএস বাংলাকে চাটার্ট ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দিয়ে ছিল। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে তাদের খরচ কমাতে বা টিকে থাকতে তাদের কর্মী ছাটাই করেছে সেখানে ইউএস বাংলা তাদের কর্মীদের ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিল। এ সময়ে একজন কর্মীকেও ছাটাই করা হয়নি তবে, অনেককে বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল এই শর্তে; পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাদেরকে আবার কাজে যোগদান করানো হবে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সকলকে আবার স্ব-বেতনে কর্মে নিয়োজিত করা হয়েছে।’

করোনা পরবর্তীতে দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ পিপাসুদের পদচারণা বেড়েছে। তাদের এমন পদচারণার ধারা অব্যাহত রাখতে হলে কী কী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন? এমন প্রশ্নের জবাবে কামরুল ইসলাম বলেন,‘করোনা পরবর্তীতে দেশের অভ্যন্তরে টুরিস্টের সংখ্যা বেড়েছে। করোনার আগে অনেকেই স্ব-পরিবারে দেশের বাইরে ভ্রমণে চলে যেতেন। আন্তার্জাতিক কিছু বিধি-নিষেধের কারণে এখন তারা স্ব-পরিবারে দেশের বাইরে ভ্রমণে যেতে পারছেন না। যেহেতু দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ পিপাসুদের পদচারণা বেড়েছে তাই, তাদেরকে এ ধারায় ধরে রাখতে হলে হোটেল বা হসপিটালিটি সার্ভিসের মান নিশ্চিত করতে হবে। ভ্রমণ পিপাসুরা যাতে নিশ্চিন্তে স্ব-পরিবারে আন্তর্জাতিক মানের সেবা গ্রহণ করতে পারে।’

সকল বিজনেসকে গতিশীল রাখে আকাশ পথ। করোনার সময়ে আকাশ পথে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়েছিল বলে বিশ্বের সকল বিজনেসের গতিশীলতা স্থবির হয়েছিল। আবার যখন আকাশ পথের চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে তখন সব ধরনের বিজনেসে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এ জন্য আকাশ পথেক চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

সম্প্রতি (১৯ নভেম্বর) মালদ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স। আপাতত, তিনটি ফ্লাইট চালু করলেও পর্যায়ক্রমে সপ্তাহে সাতটি ফ্লাইট চালু হবে। সপ্তাহে তিন দিন মঙ্গলবার, শুক্রবার ও রবিবার ফ্লাইট পরিচালনা করবে এয়ারলাইন্সটি। মঙ্গলবারের ফ্লাইটটি ঢাকা থেকে সকাল ১১টা ১০ মিনিট মালদ্বীপের রাজধানী মালের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে। এখন থেকে প্রতি রবিবার ঢাকা থেকে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট মালের উদ্দেশে উড্ডয়ন করবে এবং স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মালেতে অবতরণ করবে। একই দিন দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে মালে থেকে উড্ডয়ন করে সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।

আগামির পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন,‘আগামি ৫ মাসের মধ্যে আরও ৭টি নতুন এয়ারক্র্যাফট যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে ইউএস বাংলা এয়ার লাইন্সের। এই ৭টি এয়ারক্র্যাফটের মধ্যে ৩টি হলো- বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ও ৪টি এটিআর ৭২-৬০০। চলতি বছরে শেষের দিকে ঢাকা-কলম্বো-ঢাকা রুটে নতুন সার্ভিস চালুর প্রস্তুতিও চলছে। ২০২২ সালে জেদ্দা, দাম্মাম, রিয়াদ, মদিনা, শারজাহ ও আবুদাবিসহ বেশ কয়েকটি রুটে ও ইউরোপের কিছু গন্তব্য যেমন- লন্ডন, রোম, প্যারিসসহ কয়েকটি নতুন রুটে সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। এছাড়াও, ২০২৩ সালে ঢাকা-নিউইয়র্ক- ঢাকা রুটে ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি চলমান রয়েছে।’

একই বছর ৮টি ‘এয়ারবাস ৩৩০’ চালু করার পরিকল্পনা হাতে রয়েছে ইউএস বাংলা এয়ার লাইন্সের। এই এয়ার বাসগুলোর সিট ক্যাপাসিটি ও লাগেজ বহন ক্ষমতা অনেক বেশি থাকবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি প্রবাসিদের টার্গেট করেই এই সেবাটি চালু করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর পথচলায় প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে কামরুল ইসলাম বলেন,‘প্রতিটি এয়ারলাইন্সের মোট খরচের ৪০শতাংশই হলো জ্বালানী খরচ। গত ১৪ মাসে ১১ বার জ্বালানীর মূল্য পূন:নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ৬৭ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এয়ারলাইন্সগুলো তাদের খরচ তুলতে টিকেট মূল্য বৃদ্ধিতে বাধ্য হয়। এতে করে খরচের চাপ যাত্রীদের উপরেই গিয়ে পড়ছে। এতে করে যাত্রী প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এয়ারলাইন্সকে টিকিয়ে রাখতে যুক্তি সঙ্গত সারচার্জ নির্ধারণ খুব জরুরি। এছাড়াও, এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ (ল্যান্ডিং, পার্কিং, সিকিউরিটি) যেনো যুক্তিসঙ্গত হারে নির্ধারণ করা হয়। এয়ারলাইন্সগুলোর জমানো ব্যাকলক সারচার্জ বর্তমানে ৭২ শতাংশ হারে পরিশোধ করতে হচ্ছে যা, পার্শবর্তী সব দেশের তুলনায় অনেক বেশি। দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সারচার্জ যেনো ১২ শতাংশ হারে নির্ধারণ করা হয়। অন্তত; আগামি ৫ বছর যদি উল্লিখিত সুবিধাগুলো না দেওয়া হয় তাহলে এ শিল্প হুমকির মুখে পড়বে।’