ই-কমার্সে দেশিপণ্যের উদ্যোক্তাদের সুদিন ফিরেছে

digitalsomoy

মেহজাবীন রাখী

আজ বুধবার। ৭ এপ্রিল। ই-কমার্স দিবস। বর্তমানের বহুল আলোচিত এই শব্দের পূর্ণরূপ হলো ইলেক্ট্রনিক কমার্স। সারাবিশ্বে ই-কমার্স সপ্তাহ পালিত হয় এপ্রিল মাসের ১ থেকে ৫ তারিখ এবং বাংলাদেশে ৭ এপ্রিল থেকে ১৪ এপ্রিল। আর ৭ এপ্রিল উদযাপন করা হয় ই-কমার্স দিবস। বাজারে গিয়ে দোকান ঘুরে পণ্য কেনার অভ্যাস বদলে গেছে মানুষের। যেকোনো ডিভাইসের মাধ্যমে ইন্টারনেটের কল্যাণে ঘরে বসে পণ্য পছন্দ ও অর্ডার দেওয়ার উপায় জনপ্রিয় হয়েছে যান্ত্রিক ব্যস্ততায়। খাবার থেকে শুরু করে বিমান বা ট্রেনের টিকিটসহ দরকারী সবকিছুই মিলছে অনলাইনে। এভাবে অনলাইনে কেনাকাটার এই বিষয়টিকে বলা হয় ইলেক্ট্রনিক কমার্স বা ই-কমার্স। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবাটি গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও।

বাংলাদেশের অনলাইন কেনাকাটা নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এটির প্রতি সকলকে উৎসাহিত করতে ২০১৫ সালের ৭ এপ্রিল ই-কমার্স দিবস ঘোষণা করে দিনটি উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলো ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)। ই-ক্যাব ২০১৫ সালকে ই-কমার্স বছর এবং এপ্রিলকে ই-কমার্স মাস হিসেবে ঘোষণা করেছিলো। ই-ক্যাবের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি রাজিব আহমেদের নেতৃত্বে এই দিবস পালনের সূত্রপাত হয় এবং তখন তিনি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে বাংলাদেশে যেন ই-কমার্সের ব্যাপক প্রসার ঘটে। সে লক্ষ্য নিয়ে ই-ক্যাব এবারের ই-কমার্স দিবস পালন করছে এবং এখন থেকে ই-ক্যাব প্রতিবছর দিবসটি পালন করবে। উল্লেখ্য, সে সময় অর্থাৎ ২০১৫ সালে ই-ক্যাবের সাথে ১২৫টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছিলো এবং উদ্যোক্তাদের পরামর্শের জন্য ১৫২টি মানসম্মত কন্টেন্ট তৈরি করা হয়েছিলো যা ইতোপূর্বে অনুপস্থিত ছিলো। এছাড়াও ছিলো এ সংক্রান্ত ছয় শতাধিক ফেসবুক পোস্ট।

২০১৫ সালের এই দিবসটি ঘোষণা ও উদযাপনের ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে এবং প্রতিবার প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পায় এ খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনামূলক আলোচনা। ২০১৬ সালে ‘নিরাপদে হোক অনলাইন কেনাকাটা’ এ স্লোগানে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) যুক্ত হয়েছিলো ই-ক্যাবের সঙ্গে এ দিবস উদযাপনের উদ্যোগে। ২০১৭ সালে এ দিবসকে ঘিরে অনলাইনে কেনাকাটাকে উৎসাহী করতে ই-ক্যাব ৭ এপ্রিল-১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সদস্য প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন অফার ও ছাড় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলো। ই-কমার্সকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া ছিলো সে বছরের ই-কমার্স দিবসের মূলমন্ত্র। এভাবে প্রতিবছর এটি পালিত হয়ে আসছে।

ই-কমার্স বর্তমানে বহুল জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশেষত কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দেখা গেছে করোনার প্রকোপ বাড়তে শুরু করায় গত বছর মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে অবরুদ্ধ অবস্থা জারি করা হয় দেশে। এই সময়ে প্রায় সবাই তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা ই-কমার্সের মাধ্যমে ভোগ করেছে বিভিন্ন সুবিধা।

রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ গত বৃহস্পতিবার এপ্রিল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে  ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২১’- এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ই-কমার্স প্রসঙ্গে বলেছেন, “করোনার কারণে অনলাইনে কেনাকাটা বহুগুণে বেড়ে গেছে। ই-কমার্স এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক খাত। এই মহামারিকালে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করেই দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হয়েছে। ই-কমার্সের প্রতি ক্রেতাদের এ আগ্রহকে ধরে রাখতে হলে ক্রেতাদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে হবে।”

বাংলাদেশের ই-কমার্স এর বর্তমান চিত্রের দিকে তাকালে লক্ষ্য করা যায় দেশিপণ্যের চাহিদা বেড়েছে, বেড়েছে ক্রেতা ও বিক্রি এবং একইসাথে বেড়েছে দেশের বাইরেও দেশিপণ্যের জনপ্রিয়তা।

গেলো বছর করোনার প্রকোপ বাড়লে অনলাইন কেনাকাটার হার বৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায় এবং সেই সময়ে দেশিপণ্যের আবারও উত্থান শুরু হয়। ২০২১ সাল হবে দেশিপণ্যের বছর এমনটিই প্রত্যাশা ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের। যেহেতু এ বছরের এই সময়ে করোনার প্রাদুর্ভাব আবার বাড়ছে তাই আশা করা যায় গত বারের মত এবারও বেশিরভাগ কেনাকাটা হবে অনলাইনভিত্তিক।

ই-কমার্স দিবস নিয়ে আমরা কথা বলেছিলাম খেশপণ্যের উদ্যোক্তা এবং ‘আরিয়াস কালেকশন’র স্বত্বাধিকারি নিগার ফাতেমার সঙ্গে। তিনি বলেন,  “বর্তমান সময়ে ই-কমার্স সব থেকে পরিচিত একটি নাম। অনলাইনে পণ্য কেনাবেচার মাধ্যমকে বলা হয় ই কমার্স। একজন ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোক্তা হিসেবে বলতে চাই এই ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন আর সাবলম্বী হওয়া যায় সহজে। নিজের পণ্যের মধ্যে ইনোভেশনের মাধ্যমে ক্রেতার চাহিদা পূরণ করতে পারছি। শুধু তাই নয় এই পেন্ডামিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারছি ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় পণ্য। বাংলাদেশের ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠাতা শ্রদ্ধেয় রাজিব আহমেদ স্যারকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাতে চাই। এই ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে দেশের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এবং বেকারত্ব সমস্যা কমে আসছে”।

বর্তমান যুগ এখন প্রযুক্তিনির্ভর এবং বিজ্ঞানের কল্যাণে ইন্টারনেট সুবিধা জীবনকে করেছে সহজ। সেই ইন্টারনেটের সুবিধার বড় একটি উদাহরণ ই-কমার্স। দেশের প্রায় সব পণ্যের উদ্যোক্তা এ খাতে কাজ করছেন নির্বিঘ্নে। এক্ষেত্রে ই-কমার্স দিবস প্রতিবছর এ খাতের সুবিধা ও সচেতনতা বাড়াতে পালিত হচ্ছে। ই-কমার্স দিবস নিয়ে অনুভূতি জানতে চাইলে জামদানী পণ্যের উদ্যোগ ‘কাকলীস এটিয়্যার’ এর স্বত্বাধিকারি কাকলী তালুকদার বলেন, “পাঁচ-ছয় বছর আগেও বাংলাদেশে ই-কমার্স ততটা সফল ছিলনা। কিন্তু গত বছরে করোনা মহামারির কারণে দেশের ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং এতেই বুঝা গেছে দেশে ই-কমার্সের গুরুত্ব কতটুকু। সেই সাথে গত এক বছরে বিশেষ করে দেশীয় পণ্যের ই-কমার্স অনেক এগিয়েছে। এখন সময় হচ্ছে ই-কমার্সের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ডেলিভারি সেবা নিশ্চিত করা, যেন এরকম প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ই-কমার্স তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সহজ ডেলিভারি সেবা দিয়ে। সবাইকে ই-কমার্স দিবসের শুভেচ্ছা এবং শুভ কামনা রইলো দেশের ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির জন্য। এবারের ই-কমার্স দিবস সফল হোক”।

করোনার প্রকোপ বাড়ছে এবং অবরুদ্ধ অবস্থায় দেশ। এরই মধ্যে ই-কমার্স কাজ করে চলেছে দেশের অর্থনীতির জন্য। অনলাইন কেনাকাটায় সচেতনতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ই-কমার্সের কল্যাণে এখন দেশিপণ্যের উদ্যোক্তাদের সুদিন ফিরেছে। ই-কমার্স দিয়েছে ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট ছাড়া কেনাকাটার সুবিধা। তাই ই-কমার্স দিবস সুন্দর হোক এই প্রত্যাশা সকলের।

লেখক:  টেকজুম প্রতিনিধি, স্বত্বাধিকার ও অর্নামেন্ট ডিজাইনার, রূপস হ্যাভেন, মডারেটর, সার্চ ইংলিশ এবং  ডিজিটাল স্কিলস ফর বাংলাদেশ গ্রুপ।