প্রতিদিনই কমছে টমেটোর দাম

digitalsomoy

ধানের জেলা দিনাজপুরে গ্রীস্মকালীন নাবি জাতের টমেটো চাষ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ জাতের টমেটো চাষ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এ অঞ্চলের কৃষক। কয়েক বছর ধরেই এই জাতের টমেটো চাষ করে কৃষক বেশ লাভবান হয়েছেন। কিন্তু এ বছর ভালো ফলন পেয়েও করোনাভাইনাসের কারণে কৃষক তার উৎপাদিত টমেটো নিয়ে চরম হতাশায় ভুগছেন।

লকডাউনের কারণে পরিবহনের ভাড়া বেশি ও বাইরের ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষক। প্রতিদিনই কমছে টমেটোর দাম।

দেশে সবচেয়ে বেশী গ্রীস্মকালীন টমেটোর আবাদ হয় দিনাজপুরে। বিগত বছরগুলোতে নাবি জাতের এ টমেটো আবাদ করে ঘুরেছে এ জেলার অনেক কৃষকের ভাগ্যের চাকা। ফেব্রুয়ারির শুরুতে কৃষক এ জাতের টমেটো আবাদ শুরু করে এবং ক্ষেত থেকে তা তোলা শুরু হয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে। কিন্তু এ বছর ভালো ফলন পেলেও করোনাভাইরাসের কারণে উৎপাদিত টমেটো নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক।

মৌসুমি এ ব্যবসায় করোনার প্রাদুর্ভাবে বাইরের পাইকাররা না আসায় এবং টমেটো বাজারজাত করতে না পারায় কৃষক বিপাকে পড়েছেন। টমেটোর তুলে বিক্রি করার পর মজুরের খরচ না পাওয়ায় কৃষক টমেটো তোলা ছেড়ে দিয়েছে। তাই ক্ষেতের টমেটো এখন ক্ষেতেই পচে নষ্ট হচ্ছে।

দিনাজপুর শহরের অদূরে সদর উপজেলার ৪নং শেখপুরা ইউনিয়নে অবস্থিত জেলার বৃহত্তর টমেটোর হাট। গাবুড়া হাটে এক সপ্তাহ আগে যে টমেটো বিক্রি হয়েছে ৪৫০-৬০০ টাকা মণ দরে, সেই টমেটো বিক্রি হচ্ছে মণ ২০০-৩০০ টাকায়। দিনাজপুর জেলার সদর, ফুলবাড়ী, চিরিরবন্দর, বিরল, কাহারোল ও বোচাগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলায় বিভিন্ন জাতের টমেটোর চাষ হয়।

প্রতি মৌসুমে দিনাজপুর সদর উপজেলার কাউগাঁ, গাবুড়া,পাঁচবাড়ী বাজার,বিরল পলাশবাড়ী থেকে কয়েক কোটি টাকার টমেটো বেচাকেনা হয়। এসব টমেটো যায় ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গাবুড়ার হাটে টমেটোর আমদানি প্রচুর হলেও সেভাবে বিক্রি হচ্ছে না। দিনাজপুরের টমেটো ঢাকা-চট্রগ্রাম সহ সারা দেশের ব্যবসায়ীরা নিয়ে যায়। তাছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আগের মতো টমেটো যাচ্ছে না বলে জানান পাইকারী ব্যবসায়ীরা। তাই টমেটোর বাজারে দামে ধস নামায় বিপাকে পাইকারী ব্যবসায়ী ও চাষিরা।

দিনাজপুর সদর উপজেলার শেখপুরা গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ হোসেন আলী জানান, এ বছর আমি লাভের আশায় এক বিঘা জমিতে টমেটোর আবাদ করেছিলাম। এক বিঘা জমিতে টমেটো আবাদে খরচ হয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা। কিন্তু টমেটোর দাম না পাওয়ায় আমার খরচ উঠবে না, বরং লোকসান গুনতে হবে। একই কথা জানালেন কয়েকজন টমেটো চাষী।

ঢাকা থেকে আগত টমেটো ব্যবসায়ী রহমত উল্লাহ জানান, দিনাজপুর গাবুড়া হাট থেকে প্রতি ট্রাকে ১০ থেকে ১৫ টন টমেটো নিয়ে যাওয়া হয়। চাহিদার তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় দাম কম। তবে বেড়েছে পরিবহন ভাড়া। সরকারিভাবে টমেটো সংরক্ষণ এবং বিপণনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকলে সারা বছর এলাকার টমেটো সারাদেশে ক্রেতাদের সরবরাহ করা যেত।

দিনাজপুর সদর উপজেলার রাজারামপুর গ্রামের গাবুড়াহাটের টমেটো বাজার ইজারাদার এ্বং ইউপি চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন এখান থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ মেট্রিক টন টমেটো ৫০-৬০টি ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। টমেটো নষ্টের এবং লোকসানের হাত থেকে কৃষককে বাঁচাতে এই এলাকায় টমেটো সংরক্ষণে কোল্ড স্টোরেজ করতে সরকারসহ বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার এসএম আবু বকর সাইফুল ইসলাম জানান, এবারে জেলায় ১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে টমেটোর চাষ হয়েছে। টমেটোর ফলন হয়েছে ৫০ দশমিক ৩২ মেট্রিক টন। করোনার কানণে কৃষি শ্রমিক সংকট চলছে। অনেক কৃষি শ্রমিক ভয়ে কাজে যোগ না দিলেও যারা নিরুপায় হয়ে কাজে বেরুচ্ছেন,তারা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, কৃষক ফসলের দাম না পাওয়ায়। এমনটাই অভিযোগ কৃষি শ্রমিকের।

এ বছর দিনাজপুর জেলায় ১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে নাবি টমেটোর চাষ হয়েছে। ফলন হয়েছে, ৫০ দশমিক ৩২ মেট্রিক টন । সবচেয়ে বেশী চাষাবাদ হয়েছে সদরের গাবুড়া, কাউগাঁ, পাঁচবাড়ী, জনতা মোড়, কমলপুর এবং বিরলের পলাশবাড়ী ও পুরিয়া গ্রাম এলাকায়। অন্যান্য ফসলের তুলনায় এই টমেটো আবাদ করে বিগত বছরগুলোতে বেশ লাভবান হওয়ায় কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলের কৃষকরা এই নাবি জাতের টমেটো চাষে ঝুকেছে। এ টমেটো চাষে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে আসছে কৃষি বিভাগ। কিন্তু এ বছর ভালো ফলন পেয়েও করোনাভাইনাসের কারণে টমেটো নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক।